মুন্সিগঞ্জ জেলার একমাত্র ঐতিহাসিক ধর্মপল্লী ও প্রাচীন গির্জাশুলপুর সাধু যোসেফ গির্জা
শুলপুর সাধু যোসেফ গির্জা হচ্ছে মুন্সিগঞ্জ জেলার একমাত্র গির্জা। জেলার সিরাজদিখান উপজেলার কেয়াইন ইউনিয়নের শুলপুর, বড়ইহাজী, মজিদপুর নিয়ে গঠিত শুলপুর সাধু যোসেফের ধর্মপল্লীতে এই গির্জাটি অবস্থিত। ধর্মপল্লীর প্রায় ৩ হাজার খ্রিষ্টানধর্মালম্বী এই প্রার্থনালয়ে প্রার্থনা করে থাকেন।
ইতিহাসবিদদের মতে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামনে ১ম দিকে পদ্মা নদীর ভাঙ্গনের ফলে ঢাকা জেলার নারিশা, ঝনকী এবং মৈনোটের নিকটবর্তী আমরাবাজ গ্রাম থেকে কিছু ক্যাথলিক খ্রীস্টভক্ত এখানে এসে বসবাস করতে শুরু করে।
তখন বহু বছর যাবত এখানে আবাসিক ভাবে কোন যাজক ছিলো না। মুন্সিগঞ্জ মানেই সুলতানি আমলের মসজিদ কিংবা মুঘল জলদুর্গ নয়, বরং এর সিরাজদিখান উপজেলার সবুজ ছায়ায় ঘেরা শুলপুর গ্রামে লুকিয়ে আছে খ্রিস্টান ঐতিহ্যের এক ৩০০ বছরের পুরনো ইতিহাস।
১৭০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে পদ্মা নদীর ভাঙনে ভিটেমাটি হারানো ক্যাথলিক খ্রিস্টভক্তদের হাত ধরে এই জনপদটি গড়ে ওঠে। ইট-সুরকির গাঁথুনি আর শত বছরের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে ঘেরা এই গির্জাটি আজও জেলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বৈচিত্র্যের এক অনন্য প্রতীক। আজকের আয়োজনে আমরা ঘুরে দেখবো সিরাজদিখানের এই শান্ত ও স্নিগ্ধ ধর্মপল্লী।
পত্তনের ইতিহাস: পদ্মার ভাঙন ও নতুন জনপদের গল্প
ইতিহাসবিদদের মতে, এই ধর্মপল্লী গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে এক স্থানান্তরের গল্প। ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে, অর্থাৎ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের প্রারম্ভিক যুগে, পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙনের মুখে পড়ে ঢাকা জেলার নারিশা, ঝনকী এবং মৈনোটের নিকটবর্তী আমরাবাজ গ্রাম।
ভিটেমাটি হারিয়ে সেখানকার কিছু ক্যাথলিক খ্রিস্টভক্ত পরিবার আশ্রয়ের খোঁজে চলে আসেন সিরাজদিখানের এই শুলপুর অঞ্চলে। শুরুর দিকে দীর্ঘ বহু বছর এখানে স্থায়ী কোনো যাজক বা ফাদার ছিলেন না।
বছরে মাত্র ২-৩ বার দূর-দূরান্ত থেকে যাজকেরা আসতেন এখানকার মানুষের আধ্যাত্মিক যত্ন নিতে। সাভারের দয়াপুর (মুশুরী খোলা) গির্জা থেকে পর্তুগীজ যাজকেরা হাসনাবাদ ও বান্দুরা হয়ে শুলপুরে আসতেন। তাঁদের মধ্যে ফাদার যোসিয়ে এবং ফাদার রদোর নাম ঐতিহাসিকভাবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
- ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ: শুলপুর অঞ্চলটি বঙ্গীয় ভিকার অ্যাপোস্টলিকের অধীনে আসে।
- ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ: ইট-সুরকির গাঁথুনি এবং ছনের চাল দিয়ে এখানে প্রথম স্থায়ী গির্জাটি নির্মাণ করা হয়।
- ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দ: জুনে এখানে প্রথম আবাসিক যাজক হিসেবে দায়িত্ব নেন সি.এস.সি-র ফাদার পল তো ল্যগ্রী।
- ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দ: এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে গির্জাটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- ১৯১৯-১৯২২ খ্রিস্টাব্দ: দীর্ঘ সময় নিয়ে গির্জাটি সম্পূর্ণ নতুন রূপে সংস্কার করা হয়।
- ১১ই এপ্রিল ১৯৯৭: তৎকালীন আর্চবিশপ মাইকেল ডি রোজারিও আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত বর্তমানের দৃষ্টিনন্দন নতুন গির্জা ভবনটি উদ্বোধন করেন।
যাতায়াত ব্যবস্থা: ঢাকা থেকে দিনেই ঘুরে আসার সুবর্ণ সুযোগ
ঢাকার খুব কাছে অবস্থিত হওয়ায় ইট-কাঠের যান্ত্রিক জীবন থেকে মুক্তি পেতে মাত্র একদিনেই এই শান্ত জনপদ থেকে ঘুরে আসা সম্ভব। যোগাযোগ ব্যবস্থাও বেশ সহজ:
- বাস রুট ১: ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে সরাসরি 'সিরাজদিখান পরিবহন' এর বাসে চড়ে সিরাজদিখান আসতে পারেন।
- বাস রুট ২: এছাড়া গুলিস্তান বা নয়াবাজার থেকে 'ডিএম পরিবহন' এর বাসে করেও সিরাজদিখান বাস স্ট্যান্ডে নামা যায়।
- লোকাল যাতায়াত: বাস স্ট্যান্ডে নেমে সেখান থেকে ইজিবাইক, অটো কিংবা রিকশায় চেপে খুব অল্প সময়েই পৌঁছে যাওয়া যায় সবুজ গাছপালায় ঘেরা শুলপুর গির্জা প্রাঙ্গণে।
পার্শ্ববর্তী দর্শনীয় স্থান ও ঐতিহ্যবাহী পাতক্ষীরা
আপনি যদি একটু সময় নিয়ে বের হন, তবে সিরাজদিখান উপজেলার আরও কিছু ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান একই দিনে দেখে নিতে পারবেন। গির্জার কাছাকাছি দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- কোটগাঁও বাদশা শাহী মসজিদ খানা: কেয়াইন ইউনিয়নে অবস্থিত সুলতানি আমলের এক প্রাচীন ও ঐতিহাসিক মসজিদ।
- শেখরনগর রাজা শ্রীনাথ রায়ের বাড়ি ও কালী মন্দির: বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন শেখরনগর কালী মন্দির এবং রাজা শ্রীনাথ রায়ের জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ আপনাকে ইতিহাসের অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।
- পদ্ম হেম ধাম: লালন দর্শনে বিশ্বাসীদের জন্য বিখ্যাত লালন আখড়াবাড়ি 'পদ্ম হেম ধাম'ও এই উপজেলাতেই অবস্থিত।
জিআই স্বীকৃত পাতক্ষীরার স্বাদ
সিরাজদিখানে বেড়াতে গিয়ে এখানকার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ‘পাতক্ষীরা’ না খেয়ে ফিরলে আপনার ভ্রমণ অপূর্ণ থেকে যাবে। ক্ষীর ও দুধের বিশেষ মিশ্রণে তৈরি মাটির পাত্রে পরিবেশিত এই মুখরোচক খাবারটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হলো,
এই ঐতিহ্যবাহী পাতক্ষীরা সম্প্রতি ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (GI) স্বীকৃতি পেয়েছে। সবুজ প্রকৃতি, ৩০০ বছরের প্রাচীন খ্রিস্টান ঐতিহ্য, মৈত্রী-সম্প্রীতির আবহ আর পাতক্ষীরার মিষ্টি স্বাদ—সব মিলিয়ে সিরাজদিখানের শুলপুর আপনার যেকোনো ছুটির দিনকে করে তুলতে পারে দারুণ অর্থপূর্ণ।
মুন্সিগঞ্জের একমাত্র খ্রিস্টান ঐতিহ্য
মুন্সিগঞ্জ মানেই সুলতানি আমলের মসজিদ কিংবা মুঘল জলদুর্গ নয়, বরং এর সিরাজদিখান উপজেলার সবুজ ছায়ায় ঘেরা শুলপুর গ্রামে লুকিয়ে আছে খ্রিস্টান ঐতিহ্যের এক ৩০০ বছরের পুরনো ইতিহাস। ‘শুলপুর সাধু যোসেফ গির্জা’—যা মুন্সিগঞ্জ জেলার একমাত্র গির্জা হিসেবে সুপরিচিত।
১৭০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে পদ্মা নদীর ভাঙনে ভিটেমাটি হারানো ক্যাথলিক খ্রিস্টভক্তদের হাত ধরে এই জনপদটি গড়ে ওঠে। ইট-সুরকির গাঁথুনি আর শত বছরের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে ঘেরা এই গির্জাটি আজও জেলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বৈচিত্র্যের এক অনন্য প্রতীক সিরাজদিখানের এই শান্ত ও স্নিগ্ধ ধর্মপল্লী।
মুন্সিগঞ্জের একমাত্র খ্রিস্টান ঐতিহ্য
মুন্সিগঞ্জ বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে সুলতানি আমলের প্রাচীন মসজিদ, ইদ্রাকপুর কেল্লার মতো মুঘল জলদুর্গ কিংবা বিক্রমপুরের সমৃদ্ধ বৌদ্ধ ও হিন্দু সভ্যতার ইতিহাস। কিন্তু এর বাইরেও যে এই জেলায় খ্রিস্টান ঐতিহ্যের এক ৩০০ বছরের পুরনো শান্ত-স্নিগ্ধ অধ্যায় লুকিয়ে আছে, তা অনেকেরই অজানা।
মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার কেয়াইন ইউনিয়নের শুলপুর গ্রামে অবস্থিত ‘শুলপুর সাধু যোসেফ গির্জা’। এটি শুধু এই জেলার একমাত্র গির্জাই নয়, বরং এই অঞ্চলের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও বৈচিত্র্যের এক অনন্য স্মারক।
বর্তমানে শুলপুর, বড়ইহাজী ও মজিদপুর—এই তিনটি গ্রাম নিয়ে গঠিত শুলপুর সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী। প্রায় ৩ হাজার খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু এই প্রার্থনালয়টি।




